গুলাবো সিতাবোঃ হাসির আড়ালে লোভ, হিংসা আর ক্ষয়িষ্ণু ঐতিহ্যের আলোড়ন
ছবির নাম- গুলাবো সিতাবো
পরিচালক- সুজিত সরকার
অভিনয়- অমিতাভ বচ্চন, আয়ুষ্মান খুরানা, সৃষ্টি শ্রীবাস্তব,
বিজয় রাজ, ব্রিজভূষণ কালা
রেটিং- ৩.৫/ ৫
ধিমে তাল, বেশ খানিকটা ধৈর্য, এবং না-বলার মধ্যে বলাগুলো
শোনার প্রবণতা থাকলে গুলাবো সিতাবো আপনার জন্য। অপরদিকে, ট্রেইলার দেখে যদি মনে করেন
যে গল্পটা বাড়িওয়ালা-ভাড়াটের ঝগড়াকে কেন্দ্র করে একটা চটুল গল্প, তবে একটু আশাহত হবার
সম্ভবনা আছে। সেভাবে বলতে গেলে এই ছবিতে বলার মতো কোন গল্প নেই, ফ্রেমের পর ফ্রেম রেখে
যেন সাজানো হয়েছে একটা জীবন, যেমনটা সুজিত সরকার তার সমস্ত ছবিতেই সাজিয়ে থাকে।
এক কথায় বললে এটি কিপটে বাড়িওয়ালা এবং তার খিটকেল ভাড়াটের গল্প, যেখানে ঝগড়া আছে, রাগ আছে, হিংসা
আছে, আর ভীষণভাবে আছে লোভ। সুজিত সরকারের নির্দেশনা আর জুহি চতুর্বেদীর চিত্রনাট্য
একটা আলাদা ম্যাজিক তৈরি করেছে সারা ছবি জুড়ে। ডায়লগে মজা আছে, একে অপরের প্রতি শ্লেষ
আছে, আর আছে প্রতিনিয়ত ফুরিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর তীব্র আকুতি।
ছবির প্লট আঁকা হয়েছে লক্ষৌয়ের মত একটা শহরে যার সমস্ত অলিগলি
জুড়ে রয়েছে একটা রাজকীয় সময়ের স্মৃতি, এবং সেই স্মৃতির ধ্বংসস্তূপ বহন করে যাচ্ছে অগণিত
ধসে পড়া, ধুঁকতে থাকা মহল। এমনই এক ঐতিহ্যময় ফাতিমা মহলের মালকিন ফত্তো বেগমের স্বামী
মির্জা অধীর আগ্রহে বছরের পর বছর বসে আছে তার স্ত্রীয়ের মৃত্যুর আশা নিয়ে। এই বাড়িতের
থাকে গুটিকয় ভাড়াটে যারা এই মহলে ঘাঁটি গেড়েছে বংশপরম্পরায়। এদের কারো ভাড়া মাসে পঞ্চাশ টাকার বেশি নয়। তাই দিতে তাদের বড় অনিহা। ভাড়াটে দলের পান্ডা বাঁকের
সাথে যেন জন্মজন্মান্তরের শত্রুতা মির্জার। তবে ছবি যত এগোতে থাকে বোঝা যায় যে এই আপাত-সরল
ঝগড়ার পেছনে লুকিয়ে আছে জমে থাকা হিংসা, না
পাওয়ার বেদনা আর চরম লোভ।
লোভ যেন এই ছবির আর এক মূল চরিত্র। দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে যেন তৈরি হয়েছে লোভের একটা পার্থিব রূপ। যে লোভের খাতিরে এক বৃদ্ধের সাথে খারাপ ব্যবহার
করতে, মিথ্যে বলতে অসুবিধা হয় না কারো। এই লোভের কাছে ভালেবাসা হার মেনে যায় আর এক
কিশোরী ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে তার চেয়ে সতেরো বছরের ছোট একটি ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি
হয়। অপরদিকে সেই কিশোরও অবলীলায় মেনে নেয় সে সম্পর্ক কেবলমাত্র লোভের বশবর্তী হয়ে।
ক্রমে ক্রমে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের বিষাদ যেন ফুটে উঠেছে
মির্জার নুয়ে পড়া শরীরে, হাই পাওয়ার চশমার মোটা কাঁচে। উল্টোদিকে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধের
প্রতি বাঁকের অশালীন অভব্য ব্যবহারে ফুটে উঠেছে দারিদ্র্যের আর্তি, প্রেমে ব্যর্থতা।
সংলাপে আপাত হাসির খোরাক থাকলেও তার আপাদমস্তক সুক্ষ্ম শ্লেষে ভরা।
মির্জার চরিত্র অমিতাভ বচ্চন এককথায় অসাধারণ। ওই ছফুটের লোকটাকে
ঝুঁকে পড়ে, ধুঁকতে ধুঁকতে সংলাপ বলতে দেখলে তার অভিনয়স্বত্বার প্রতি শ্রদ্ধা বাড়তে
বাধ্য। আয়ুষ্মান খুরানা তার প্রতিটা চরিত্রেই
অসামান্যতার পরিচয় দিয়ে এসেছে প্রথম থেকে। এখানেও তার অন্যথা হয়নি। বাঁকের বোনের গুড্ডোর
ভুমিকায় সৃষ্টি শ্রীবাস্তব বেশ দৃঢ়, নৃতত্ত্ববিদের চরিত্রে বিজয় রাজ বা উকিলের ভূমিকায় ব্রিজভূষন কালা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ
এবং ছাপ রাখে। এই আপাত- বিষাদময় পরিস্থিতিগুলোতে বেগমের আবির্ভাব এই ছবিকে এক অন্য
মাত্রা দেয়। জীর্ণ শরীরেও তার সমস্তটাকে আগলে
রাখার ক্ষমতা, তার বুদ্ধিমত্তা সুচারুভাবে দেখিয়েছেন সুজিতবাবু। ৯২ বছরের ফারুক জাফার
সত্যিই অসাধারণ।
লক্ষৌর অলিগলি, বাজার দোকান, সরকারী অফিস, লাইব্রেরির দৃশ্যগুলোর
মধ্যে রয়েছে অদ্ভুত এক বিষাদ। আত্মীয়স্বজনের তীব্র নিন্দাকেই না দেখার ভানের মধ্যে
রয়েছে মির্জার এক অদম্য লড়াই। কি দেখে বেগম তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল?- এ প্রশ্নের চকিত জবাব " হামারি জাওয়ানি" হাসির উদ্রেক
করে বটে তবে তার গভীর পৌছতে পারলে দেখা যায় তাতে রয়েছে নিজেকে গোপন করার নিবিড় প্রচেষ্টা।
বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় নীল বেলুন নিয়ে মির্জার হেঁটে যাওয়ার
দৃশ্য বা রাজকীয় চেয়ার টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যগুলো কোথায় যেন নীরবে আঘাত করে।
এতগুলো গভীর স্তরের মধ্যেও যেন কাহিনীর গতি একটু দ্রুত হলে
বা কিছু অহেতুক দৃশ্য না থাকলে যেন আর একটু সুঠাম হতো।
যাই হোক, লক্ষৌর পটভূমিকায় গুলাবো সিতাবো নামের দুই পুতুল
নাচের চরিত্রের নামে ছবির নামকরণের মধ্যেও যে একটা সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন তা ভাববার
মত বিষয়।

Comments
Post a Comment