কণ্ঠঃ ভাঙা ছকের কথোপকথনে নিস্তব্ধতার শব্দ

Image source: Google

কন্ঠ, যতটা পেলব ঠিক ততটাই প্রবল একজন রেডিও জকি বা যে কোন বাচিক শিল্পীর কাছে। এ ছবির গল্প অনেকটা চেনা কিছুটা অচেনা ছকে বাঁধা। তাই চট করে গল্পের প্লটটা বলে নেওয়া যাক। প্রখ্যাত রেডিও জকি অর্জুন মল্লিক (শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়) তার ভয়েস অফ দ্যা ইয়ারের পুরস্কার নেবার দিন আবিস্কার করেন যে তার গলা থেকে আওয়াজ বেড়নো দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। ডাক্তার জানায় এ ক্যান্সার এবং বাঁচার উপায় একটাই তাঁর ভয়েস বক্সটা বাদ দিতে হবে। তারপর, তার স্ত্রী পৃথার (পাওলি দাম), স্পি থেরাপিস্ট রুমেলা চৌধুরী (জয়া আহসান) এবং তার নিজ অর্জিত উইলপাওয়ারের সংমিলিত প্রচেষ্টায় হয়ে ওঠেন এক অনবদ্য মানুষ, একটা রক্তমাংসের ইন্সপিরেশন।


Image source: Google
চলে আসি চরিত্র বিশ্লেষণে।সিনেমার ওপেনিং সিনে শ্রীজাতর কবিতার লাইন "... ডিপ্রেশনের বাংলা জানি। মনখারাপ" কবিতার সঙ্গে ডিরেক্টর তথা অভিনেতা শিবপ্রসাদ একজন আর.জের ভুমিকায় যথাযথ। সেই মুহুর্তে আমি আবিস্কার করলাম, আহা লোকটার গলা সত্যিই সুন্দর। তিনি সত্যি সত্যি আর.জে কেন নন? এ দৃশ্যে তিনি এও বুঝিয়েছেন কথা না বলে কষ্ট প্রকাশের অভিব্যক্তি,লুকিয়ে রাখা অসহায়তার ফেসিয়াল রূপ। এই চরিত্রটি পেশায় যে কেউ হতে পারতো, শিক্ষক, দোকানদার, আইটির ম্যানেজার, যে কেউ; তবে আপনার সবচেয়ে পছন্দের জিনিসটা নির্মমভাবে কেড়ে নেওয়ার মধ্যেই তো লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বেশি হারানোর ভয়। তাই চরিত্রটির একজন রেডিও জকি নিদেনপক্ষে একজন বাচিক শিল্পী হওয়ার প্রয়োজন ছিল। স্ত্রীয়ের ভুমিকায় পাওলি যথাযথ, তবে একজন দায়িত্বপরায়ন সংবেদনশীল স্ত্রী একবারও কি বলতে পারতো না, একে ওপরকে বুঝে নিতে শুধু কথা নয়, কথোপকথন প্রয়োজন হয়। এবং সমস্ত কথোপকথনে কন্ঠের প্রয়োজন হয়না। কেন সে পড়তে পারে না? কেন বারবার এগিয়ে দেয় বোর্ড আর মার্কার? স্পিচ থেরাপিস্ট রূপে জয়া আহসান কি স্মার্ট।। এই স্মার্টনেসই বলে দেয় এনার স্টুডেন্ট, স্টুডেন্ট অফ দ্যা ইয়ার হবেই হবে। তবে, শিক্ষিকা হিসাবে তিনি ভীষণ কড়া। এককথায় অসাধারণ। ডিরেক্টরদ্বয় (শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা দাস) এই চরিত্রটিকে বাংলাদেশর অধিবাসী করায় খুব সুচারুভাবে ঢাকা পরে গেছে তার কথার মধ্যেকার বাঙাল কথার টান, যদিও ব্যক্তিগত ভাবে ওঁর ওই টানটা আমার বেশ ভালোই লাগে। তবে শেষে কোথাও একটা প্রেম আর বন্ধুত্বের টানাপড়েন দেখনোটা কি খুবই প্রয়োজন ছিল? এই দুই সম্পর্ক ছাড়াও তো সম্পর্কগুলোকে সুন্দর রূপ দেওয়া যায়। হয়তো এটাই কমার্শিয়ালিজমের দায়। ছোট্ট চরিত্রে একজন ক্যান্সার সারভাইভার হিসাবে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রানবন্ত ও পজিটিভ এনার্জিতে ভরপুর। বন্ধুর চরিত্রে কনিনিকাও খারাপ নয়।

Image source: Google
এ ছবির কিছু কিছু দৃশ্য অসাধারণ। পারস্পরিক ইমোশনাল ডিসরাপ্টেড সিচুয়েশনে পৃথা আর অর্জুনের মানসিক ভাবে দূরে সরে যাওয়ার দৃশ্যগুলি, ছেলেকে ছাদ থেকে পড়ে যেতে দেখেও কিছু করতে না পারার দৃশ্যগুলো মন ছুঁয়ে যায়। কণ্ঠে যে আর কথা নেই সেকথা ভুলে অভ্যাসবশত ফোন তুলে কথা বলতে যাওয়ার দৃশ্যগুলোর দর্শকেরও বাকরোধ হয়ে আসে আবেগে। তবে, সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যপট যদি তৈরি হয়ে থাকে তা হয়েছে প্রথম দৃশ্যে যেখানে সমস্ত শহর, এক হয়ে গেছে একজনের কন্ঠে, অফিসফেরতার দল, নাইটগার্ড, সারারাত কর্মরত ট্যাক্সি ড্রাইভার, ব্যালকনিতে বসে থাকা একা ছেলেটা, অথবা বাথটবে গা এলানো সম্ভ্রান্ত একাকী বৃদ্ধ সকলে এক হয়ে মিশে যাচ্ছে রেডিওতে, অথচ প্রত্যেকেই নিজের নিজের মতো করে একা।

শেষমেশ এই আকন্ঠ লড়াইয়ের ফলাফলটা কিন্তু তোলা রইল প্রেক্ষাগৃহে। বাকিটা ওখানে গিয়েই দেখে আসুন না হয়। সর্বশেষে “কণ্ঠ”-কে পাঁচে সাড়ে তিন দিলাম। বাকি নাম্বার কোথায় কাটলাম জানিনা।হয়তো এনাদের "মুক্তধারা" দেখেছি বলি এক্সপেক্টেশনটা ভেরি ভেরি হাই। যাই হোক, এ সিনেমা দেখার পর স্মোকাররা একবারের জন্যও যদি স্মোকিং কুইট করার কথা ভাবেন তাহলেই এ ছবি সফল।


Comments

Popular posts from this blog

9 Types of Bengalis You Will Surely Find in a Durgapuja Pandal

৭ জন সমসাময়িক অনুপ্রেরনীয় নারীদের সাফল্যের গল্প