এথিক্স ও দায়বদ্ধতার মুখোশের নিচে আমরা সবাই জোকার

হাসি বড় শ্লেষের, কোথাও বা বিষাদের।

সমস্ত মানুষ তার জীবনটাকে দুবার বাঁচতে চায়। একবার মনে মনে, ঠিক যেমনটা তার স্বপ্ন, আর একবার বাস্তবে। কিন্তু যাদের স্বপ্নপূরণ হয় না, তাদের বাস্তবটা কি একই রকম হয়? জোকার সিনেমাটা দেখতে দেখতে এই কথাগুলোই মাথায় ঘুরছিল। প্রথমেই বলে রাখি কোনো কমিকবুকের চরিত্রের সাথে মেলাতে গেলে নতুন কিছু এক্সপোর করা যাবে না, তবে দেখার আগে প্লট এবং সময়টা একটু জেনে নিতেই হবে। নয়তো জোকারের জন্ম রহস্যে অনেক প্রশ্ন উঠবে।

আচ্ছা, এবার যদি একটু দূরে সরে এসে পাখির দৃষ্টিতে দেখি, মানে ভুলে যাই এই ক্রিমিনাল অধ্যুষিত গথাম সিটি, আরখাম স্টেট হসপিটাল, থমাস ওয়েন বা আর্থার ফ্লিককে, তাহলে হয়তো পরিস্থিতির মুখে আমি আপনি সবাই আস্তে আস্তে জোকার হয়ে উঠতে পারি। জোকারকে যদি ডার্ক ক্যারেক্টার বলে ব্রাত্য করা হয় তাহলে সমাজের প্রতিটা মানুষই ব্রাত্য। আসলে, জোকার কোনো চরিত্র নয়, একটা জার্নি।

ধরুন, আপনি এমন একজন মানুষ যার উপস্থিতি কিম্বা অনুপস্থিতিতে কারো কিছু যায় আসে না, অথচ আপনারও তো একটা মন আছে, মনে মনে কিছু একটা হয়ে ওঠার স্বপ্ন, একটা প্রতিষ্ঠিত মুখ হয়ে ওঠার ইচ্ছা। এরকম এক পরিস্থিতিতে আপনি আবিস্কার করলেন আস্তিস্বের লড়াই বড় বিষম লড়াই। আপনার কি মনে হবে না, সব নাগুলোকে জোর করে হ্যাঁ করে দিতে? সব না পাওয়াগুলোকে ছিনিয়ে নিতে? হয়তো বলবেন মনে হলেই তা বাস্তবে করা যায়না, কারণ, মানুষ অভ্যাসের দাস ও আদর্শের হাতে পুতুল। কিন্তু এই সো কলড এথিক্স না থাকলে, পাপ-পুণ্যবোধ না থাকলে, হারানোর ভয় না থাকলে আমরা সবাই আস্তে আস্তে হয়ে উঠবো এক একটা জোকার।

এবার একটু সিনেমা জোকারে ফেরা যাক। হাসি ব্যাপারটা এই সিনেমায় খুব সিম্বলিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রোটাগনিস্ট (অথবা অ্যাণ্টাগনিস্ট) আর্থারের নাকি এমন একটা সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম আছে যার দরুন সে যে কোনো অপ্রীতিকর অবস্থাতে অজান্তেই হেসে ফেলে। একটু ভালো করে লক্ষ্য করে দেখা যাবে সেই হাসি বড় শ্লেষের, কোথাও বা বিষাদের। একটা বিষণ্ণ সময়ে “always put on a happy face” কথাটা যেন একটা জলজ্যান্ত আয়রনি।

সিনেম্যাটোগ্রাফি, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, বা সেট ডিজাইন এতটাই পারফেক্ট যে তার দিকে আলাদা করে চোখকান দিয়ে ধরতে হয়না। তার সাথে কমপ্লিমেণ্টারি ওয়াকিন ফিনিক্সের অভিনয়। একজন অভিনেতা কতটা ভালো অভিনয় করলে বাদবাকি চরিত্রগুলোর অস্তিত্ব আলাদা করে টের পাওয়া যায় না, তা এই সিনেমা না দেখলে বোঝা যায় না। গল্পের স্ট্রাকচার অনেকটা ট্যাক্সি ড্রাইভারের থেকে উদ্বুদ্ধ বলা যেতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায় টড ফিলিপ্স এমন একটা মাস্টারপিস উপহার দিলেন যা হয়তো ডিসি লাভার বা নন-লাভার সবার জন্যই।

সব শেষে এটুকু বলব, এন্টারটেনমেন্ট পেতে চাইলে এই সিনেমা দেখতে যাবেন না। তবে জোকারকে ভিলেন বলে চিহ্নিত করার আগে একবার অন্তত ভেবে দেখুন- আপনার মুখোশটাই যদি কোনোদিন অন্য মানুষের কাছে ইন্সপিরেশন হয়ে ওঠে, আপনি কি সেই মুখোশটা কখনো খুলতে চাইবেন?

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

9 Types of Bengalis You Will Surely Find in a Durgapuja Pandal

৭ জন সমসাময়িক অনুপ্রেরনীয় নারীদের সাফল্যের গল্প

কণ্ঠঃ ভাঙা ছকের কথোপকথনে নিস্তব্ধতার শব্দ