কবীর সিং- “টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি”-র আড়ালে চাপা পরা চরিত্রায়ন যা আশার আলো দেখায় না
কবীর
সিং
অভিনয়ঃ
শাহিদ কাপুর,
কিয়ারা
আদবানি।
পরিচালনাঃ
সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা
রেটিং-
২.৫/৫
প্রথমে আসে পেট্রিয়ার্কি, তারপর আসে প্রচণ্ড পেট্রিয়ার্কি। সবশেষে আসে কবীর সিং।
ফেমিনিস্ট বলে গালাগাল দেবেন তো? তার আগে একটু গল্পটা শুনে নিন।
একজন স্মার্ট, মেধাবী, ডাক্তারির ছাত্র সর্বগুণ সম্পন্ন, কিন্তু অ্যারোগ্যান্ট, রুড।
সে প্রেমে পড়লো এক জুনিয়ার স্টুডেন্টের। নাম তার প্রীতি সিক্কা। পড়লো মানে মেয়ে
সিলেক্ট করে প্রেমিকা হিসাবে ঘোষণা করলো। সেই মেয়েও আপত্তি করলো না, চরম প্রেম করলো, পটাপট
কয়েকটা চুমু খেলো। তারপর, বাড়িতে
জানাতে গিয়েই হল বিপত্তি। প্রেমিকার বাড়িতে মানলো না, এবং অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেলো, আর
প্রেমিক কবীর সিং মদ,
মেয়ে , আর
সিগারেটে ডুবে গেল। যখন প্রেমিকার সাথে দেখা হল তখন সে একা ও সন্তানসম্ভবা। সবশেষে প্রেমিক-প্রেমিকার মিল।
আজকাল ভারতীয় সিনেমার এই উন্নতির দিনে এই রকম গল্প ঠিক
পাতে দেওয়া যায়না। এবার আসা যাক সিনেমার লজিক্যাল পয়েন্টে। ভারতীয় উপমহাদেশে
স্টকিং, ইভটিজিং এমন কিছু বড় কথা নয়, তবে তাকে সিনেমার মাধ্যমে গ্লোরিফাই করাটা বোধহয় কোন কাজের কথা নয়, যদিনা সেটাকে সারকাস্টিক্যালি দেখানো হয়। এই ব্যাপারটা যে কোন সিনেমাতেই উঠে আসেনি তা নয়। ২০১৩ সালে নির্মিত “রাঞ্ঝনা” ছবি অথবা ১৯৯৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত “ডর” তার সাক্ষ্য বহন করে। প্রেমে না পরা অবধি ছেলেটির
মেয়েটিকে স্টক করা যেন আমাদের রোজকার জীবনের নর্মাল ব্যাপার। তা বলে এই ডার্ক
সাইডগুলো সিনেমাতে দেখানো যাবে না তা নয়। কিন্তু, সেটাকে হৈ হৈ করে সেলিব্রেট করাটা বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি।
এই ছবিতে অনেক স্ববিরোধী দিক রয়েছে। যেমন, নায়ক কবীর সিং একজন মেধাবী ডাক্তার, কিন্তু সারা ছবিতে পড়াশোনার দিকটাকে তেমন গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। ফুটবল খেলতে
গিয়ে একজনকে প্রায় মেরেই ফেলছিল, তার
কোনো রকম চাঞ্চল্যকর প্রভাব নেই, উল্টে
ক্লাসে ঢুকে সে একজন শিক্ষককে কথা শুনিয়ে দিয়ে যায়, যার পরিপ্রেক্ষিতে ক্লাসের ছাত্রছাত্রী উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানাচ্ছে।
এবার একটু আলোকপাত করা যাক কবীরের প্রেমিক স্বত্বায়। সেই চিরাচরিত “love at first sight” ব্যাপারটাও কেমন যেন অদ্ভুত। প্রেম নয়, প্রেমের সিলেকশন পর্ব হয়ে যাবার পর পুরো হোস্টেলকে জানানো হল তার প্রেমের
ব্যাপারে অথচ প্রেমিকা জানতে পারলো সবার পরে। আর প্রেম বলতে যা ছিল তা এরকম- আমি তোমার
প্রেমে পড়েছি, অতএব তুমি আমার গার্লফ্রেন্ড, এটাই তোমার পরিচয়। এবার তুমিও আমাকেই ভালবাসবে। তোমাকে আমি আর কারুর সাথে কথা বলতে দেব না।
তোমার কোন বন্ধু-বান্ধবী থাকা উচিৎ নয় কারণ তোমার আমি আছি। আর প্রেমিকার মুখে কোনো
রা কাড়লো না। মনে মনে বলে দিলো- “ওকে”। অথচ, যে প্রেমের জন্য এত টানাপড়েন, সেই প্রেমটাই তো ভালো করে দেখাতে পারলেন না ডিরেক্টর সাহেব সন্দীপ রেড্ডি
ভাঙ্গা। গানের সিকয়েন্সে একটু খুনসুটি আর মিনিটে মিনিটে চুমু দেখালেই কি একটা
প্রেমকে ডিফাইন করা যায়,( ?) যেখানে
মূল চরিত্রের চরিত্রায়ন দাঁড়িয়ে আছে ওই প্রেমের ভিত্তিতে? ওদিকে ডাক্তার কবীর সিং-ও কতটা ভরসাযোগ্য জানা নেই। সে মদ্যপ অবস্থায়
অপারেশন করে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত তার কোন পেসেন্টের ক্ষতি হয়নি এটাই
তার গর্ব।
অভিনয়ের দিক থেকে শাহিদকে ১০ এ ১০ দেওয়া যেতে পারে।
চরিত্রটি ভালো খারাপ যাই হোক, সেটি
দারুণ ভাবে অনস্ক্রিন ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই হায়দারের শাহিদকে ফিরে দেখা হল এতদিন
পর। কবীরের প্রেমিকা প্রীতির চরিত্রে কিয়ারা রয়েছে শুধু কিছু পিকচার পারফেক্ট
গানের সিকয়েন্স তৈরি করতে। তিনি এমন কিছু অভিনয়ের সুযোগ পায়নি বললেই চলে, ওই শুধু দু-একটা চুমু আর থাপ্পড় খাওয়া ছাড়া। তবে, সুযোগ পেয়ে কয়েকটা থাপ্পড়
লাগিয়েছেন, ব্যাস। কবীরের বন্ধু শিবার চরিত্রে সোহম মজুমদার মন জয়
করে নেবার মতো। কবীরের দাদির ভূমিকায় কামিনী কৌশল বেশ স্মার্ট ও মন ভালো করা একটা
চরিত্র। বাবার চরিত্রে সুরেশ ওবেরয় রয়েছেন, কিন্তু তাকে তেমন কাজে লাগানো হলো না। গান ও
ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক অন্য মাত্রার।
এই ছবির নাম ভূমিকাকে জাস্টিফাই করতে একটা কথা বারবার
উঠে এসেছে- “টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি”। সেটা তো পুরো মাত্রাতেই আছে, তাতে
আঙুল তুলছিনা, কিন্তু পুরুষালি উদ্দাম দেখিয়ে একটা তথাকথিত নায়কের
চরিত্রকে সাজানো যায়না, নতুবা
তা স্ববিরোধী হয়ে দাঁড়ায়। সারা দেশ জুড়ে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি সিনেমায় এই ধরনের
চরিত্রকে দেখানোর আগে একটু পরিচালক আর একটু সাবধানতা অবলম্বন করলে বোধয় ভালো
করতেন। সেই পুরোনো প্রবাদ “Hero can’t go wrong” নিয়ে কাজ করার আগে সামাজিক দিকটা দেখা উচিত, আজও ভারতবর্ষের লক্ষাধিক মানুষ সিনেমার হিরোকে নকল করে জীবনের তিক্ত
দিকগুলোকে ভুলতে চায়। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, এই ছবি কোন আলোকিত রাস্তা দেখায় না দর্শক কুলকে।

Comments
Post a Comment