আর্টিকেল ১৫- সামাজিক কদাচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এক শক্তিশালী হাতিয়ার
![]() |
| Image Source: Google |
সমাজ একটা
বড় সিস্টেম। সেই সিস্টেমে কেউ রাজা, কেউ প্রজা,
কেউ সিপাহী। কিন্তু সমস্যা হয়ে যখন এই এত বড় কর্মকাণ্ডের মধ্যে যদি এমন কেউ এসে পড়ে যে
এই রাজার রাজতন্ত্রকে ভাঙতে চায়। এমনই এক পরিবর্তন আনার গল্প আর্টিকেল ১৫।
ঝাপসা,
স্যাঁতস্যাঁতে একটি দলিতদের (?) গ্রামের দৃশ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই ছবিটি প্রথমেই বুঝিয়ে
দেয় এখানে এমন অনেককিছু দেখতে চলেছি যা আমাদের নতুন ডিজিটাল ইন্ডিয়ার মানুষেরা
একটা সো কলড মিথ বলে মনে করি। গল্পটি চট করে বললে এই দাঁড়ায়- তরুন আইপিএস অফিসার
আয়ান রঞ্জনের (আয়ুষ্মান খুরানা) পোস্টিং হয় উত্তরপ্রদেশের এক অজ পাড়াগ্রাম লালগাঁওতে।
দিল্লিতে থাকা নিউ ইন্ডিয়ার তরুন মুখোমুখি হয় সভ্য প্রগতিশীল সমাজের আড়ালে লুকিয়ে
থাকা ভয়াবহ সত্যের সাথে। হঠাৎ তিনটি নাবালিকার অন্তর্ধান ও দুজনের মৃত্যুর খবর আসে
থানায়। সত্যতা খুঁজতেই বেড়িয়ে একের পর এক লুকোনো তথ্য।
অভিনয়ের
দিক থেকে প্রায় প্রত্যেকেই নজরকাড়া। আইপিএস অফিসারের ভুমিকায় আয়ুষ্মান অনবদ্য। প্রতিটি
ছবিতেই তাঁর স্ক্রিনপ্রেজেন্ট এক অন্য মাত্রা নিয়ে আসে। সেই “ভিকি ডোনার” থেকে তিনি বুঝিয়ে আসছেন যে
তিনি লম্বা রেসের ঘোড়া। প্রতি পরতে পরতে তার বদলে যাওয়া বিশ্বাসের অভিব্যক্তিগুলো
সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে তার মুখে। তাঁর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেছে কুমুদ
মিশ্রা আর মনোজ পাহ্যার মতন প্রতিভাবাণ অভিনেতারা। দাঁতে দাঁত চেপে ঠাণ্ডা গলায় “অওকাত ওহি হে যো হাম দেতে হ্যায়” বলায় ফুটে উঠেছে নির্মম ক্রূরতা। শিডিউলড কাস্ট সাহসী তরুণী গৌরার ভূমিকায় সায়নী ঘোষ অসাধারণ। ছবিতে তাঁর ডায়লগ কম ছিল
কিন্তু চোখের ভাষার সে বলে গেছে অজস্র কথা। তরুণ লিডারের ভূমিকায় জিসান আয়ুবের
অভিনয় মনে রাখার মতন। হাসি মুখে যেন সমাজের সমস্ত বিষাক্ত কথাগুলো বল যেতে পারে।
এই সিস্টেমের চাপে পরে জীবনের কত ছোট ছোট মুহূর্তের স্বাদ নেওয়া হয়নি সেই হিসাব
করার দৃশ্যটি এক নিমেশে চোখে জল নিয়ে আসবে। আর তাঁর ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তাঁর
জীবনে ঘটে যায় মর্মান্তিক এক ঘটনা, যা কাম্য নয়, কিন্তু বাস্তবে অবশ্যম্ভাবী।
ছবির
সিনেম্যাটোগ্রাফি বেশ সুন্দর। ৮০% দৃশ্যে ধোঁয়াশায় ঢাকা কালচে ছবি দেখিয়ে একটা
অস্বস্তিকর অনুভূতির উদ্রেক করতে পারে। আদতে, এই অনুভূতিই নিউ ইন্ডিয়া আর রিয়েল
ইন্ডিয়ার মধ্যেকার তফাৎ। রাস্তায় পরে থাকা আস্তাকুঁড়ের মধ্যে নেমে পরে বদলে যাওয়া
পরিস্থিতির বিরুদ্ধে নিজেকে ধীরে ধীরে তৈরি করার দৃশ্যটি অন্য এক মাত্রা যোগ করে।
আরও একটি লক্ষ্য করার বিষয়- ছবিতে হিরোর এন্ট্রি আর এক্সিট। আইপিএস আয়ান রঞ্জনের
এন্ট্রিতে গ্রাম সুজলা সুফলা, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বব ডিলানের ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড।
তারপর তাঁর বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে শেষ দৃশ্যে গ্রাম, তথা ভারতের আরও একটা দিন
উঠে আসে, ততক্ষণে ব্যাকগ্রাউন্ডে জয় হিন্দ।
এতগুলো
রিয়েলিস্টিক দিক থাকা সত্বেও বেশ কিছু বলিউডি এফেক্ট রয়েছে যা একটু তলিয়ে দেখলে খুবই
অসম্ভব মনে হতে পারে। ছবির নাম আর্টিকেল ১৫, কিন্তু এই আর্টিকেলের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ
করা হল না, তার একটা কপি নোটিশবোর্ডে টাঙানো হল, এই যা। আরও একটু বিস্তারিত ভাবে
থাকলে হয়তো ভাল হতো। যুগ যুগ ধরে চলে আসা অস্পৃশ্যতাকে যত সহজে আয়ান রঞ্জন মেরে
কুপকাত করে দিলেন বাস্তবে ততটা সহজ বোধহয় নয়। তাছাড়া, তথ্যপ্রমাণ দাখিল করেও যে
সিবিআই অফিসারের মত বদল করা গেল না, তার মন কয়েকটা বলিউডি ডায়লগে গলে গেলো? যাই
হোক, এসব ধরলে তো কমার্শিয়াল ছবি বন্ধ হয়ে যাবে, তাই না? আর কিছু কিছু মনভালোকরা
জিনিস রুপোলী পর্দায় দেখলে অন্যরকম একটা ভাললাগা কাজ করে। তবে, আয়ান রঞ্জনের রিয়েলাইজেশনের
মধ্য দিয়ে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে হার দেখালেও এমন কিছু ক্ষতি হতো না বলে আমার
ধারণা।

Comments
Post a Comment