ভিঞ্চি দাঃ শিল্প ও বুদ্ধিমত্তার থ্রিলিং সংমিশ্রন
![]() |
| শিল্পী এবং মানব স্বত্ত্বা করে দেয় এই দৃশ্যগুলো |
গল্পটা যে
একটা টানটান উত্তেজনাপূর্ণ সেটা ছবির ট্রেলার দেখেই আন্দাজ করা যায়। ছবিটিকে একটা নির্ভেজাল সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার বললে বোধহয় অত্যুক্তি
করা হবেনা। চলে আসি সোজা গল্পে। এটা আসলে একটা সোজাসাপটা টলিপাড়ার খেটে খাওয়া, অথবা বলা ভালো খুঁটে খাওয়া এক মেকআপ
আর্টিস্টের হঠাৎ করে পাল্টে
যাওয়ার গল্প।
গল্পের
কথক ভিঞ্চি দা, ওরফে রুদ্রনীল ঘোষ, একজন
প্রস্থেটিক মেকআপ আর্টিস্ট যিনি তাঁর কাজটিকে রীতিমত শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে
পারেন, এবং তার যথাযথ দাম না পেলে মাথা নোয়াতে প্রস্তুত নয়। একই সঙ্গে চলতে থাকে
আদি বোস (ঋত্বিক চক্রবর্তী) নামের একজন সাইকোপ্যাথ উকিলের গল্প যিনি সমাজের বৃহত্তর অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার
স্বার্থে ছোটখাটো অপরাধ করে তাদের পাপের বোঝাকে ব্যালেন্স করার চেষ্টা করে। সমস্যা শুরু হয় যখন আর্টিস্টের সারভাইভাল আর সাইকোপ্যাথের
প্যাশন একি খাতে বইতে থাকে। একদিন অজান্তেই ভিঞ্চি দা সামিল হয়ে যায় আদি বোসের
সিরিয়াল কিলিংয়ে, এবং তা চলতেই থাকে; যদিও, সব শেষে একদিন সেই জাল কেটে বেরিয়ে আসে সে।
গল্প
বলার কায়দা দুর্দান্ত। মজার ব্যাপার এই যে খুনি কে, বা কিভাবে ক্রাইমগুলো হচ্ছে তা
নিয়ে দর্শকের সঙ্গে কোন লুকোচুরি নেই। তবুও চিত্রনাট্যের স্মার্টনেস আর সাবলীল
গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কায়দা এক মুহূর্তের জন্য চোখের পলক ফেলতে দেয় না।
এই ছবির
অভিনেতা, অভিনেত্রীদের নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। ভিঞ্চি দার ভূমিকায় রুদ্রনীল
সহজ, কনফিডেন্ট, এবং আবেগপূর্ণ। তার ডায়লগ ডেলিভারি এক আলাদা মাত্রা আনে। সোহিনীর
উপস্থিতি প্রথম দিকে দমবন্ধ করা সিকোয়েন্সগুলোর মধ্যে একটা কমিক রিলিফ বলে মনে
হলেও শেষে বোঝা যায় এই চরিত্রটির গভীরতা। একজন মানসিক বিকারগ্রস্থ মানুষের ঠাণ্ডা
চোখের অভিব্যাক্তি যথাযথ ফুটে উঠেছে আদি বোস চরিত্রের ঋত্বিকের ভেতর। ইনস্পেক্টর
বিজয় পোদ্দারের ভূমিকায় অনির্বাণ ভট্টাচার্য ব্যাক্তিত্বপূর্ণ। আদি বোসের ছোটবেলার
ভূমিকায় রিদ্ধি সেন কয়েক মিনিটে দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। নিজের বাবাকে খুন করার পর অবলীলার
হাত মুছে বই নিয়ে পড়তে বসে যাওয়ার দৃশ্যটি অসাধারণ।
বেশ
কিছু অসাধারণ ড্রিম সিকোয়েন্স আছে এই ছবিতে। নিজের প্রেমিকাকে মোনালিসা কল্পনা করে ছবি আঁকার কালারফুল
স্বপ্ন বদলে গিয়ে কালচে নীল হয়ে যাওয়াই মেকআপ আর্টিস্ট ভিঞ্চি দার মানসিক পরিবর্তনের
ইঙ্গিত দেয়। শিল্পী এবং মানব স্বত্ত্বা করে দেয় এই
দৃশ্যগুলো। এমনই এক স্বপ্ন দৃশ্যে সিরিয়াল কিলার আদি বোস শিল্পী ভিঞ্চি দার ঘাড়ের কাছে
মুখ এনে যখন বোঝায় জাস্টিসের মানে, মুহূর্তের মধ্যে দুটো স্বত্বা এক হয়ে যায়। ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা লোকটাকেও খুনি ভেবে দূরে সরিয়ে দিতে ইচ্ছে
করবে না। নিৎসের ব্যবহিত “উবারমেনশ” শব্দটির বারবার এনে আদি বোসের সাধারণ
মানুষের “সুপারম্যান” হয়ে ওঠার তত্ত্ব দেওয়ার ভঙ্গী বেশ কনভিন্সিং। এর অর্থ না
জানলে বাড়ি ফিরে গুগল করতে আপনি বাধ্য হবেন।
সৃজিত মুখার্জির আসল চমক থাকে শেষ পনের মিনিটে, এখানেই তার ব্যতিক্রম নেই। কারো কাছে শেষ সাসপেন্সটি প্রেডিকক্টেড হয়ে গেলেও সেটা সৃজিতের ভার্সন কেমন হয় দেখার জন্য মনটা
ছটফট করবেই। একটাই খুব চোখে লাগার মত দিক- শেষ দৃশ্যের প্রস্থেটিক মেকআপের সাথে আগের ভিঞ্চি দার করা মেকআপের যেন
কোন মিলই নেই। এরকম আরও কিছু ছোটখাটো ভুল ত্রুটি ছাড়া গোটা ছবিটাই একটা মেন্টাল
ট্রিট যা দমবন্ধ করে দেখা যায়।
