রাজকীয় পরিবেশনঃ ফিল্ম রিভিউ, এক যে ছিল রাজা।



সৃজিতের সিনেমা আমার কাছে অনেকটা চুমু খাওয়ার মতো। শেষ হওয়ার পরও মনে হয় আর একটু হলে ভালো হত। কিন্তু ভালোর তো কোনও শেষ নেই। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের “এক যে ছিল রাজা”-কথা রেখেছে। ঠিক যেমনটা সিনেমার ট্রেইলারে বলেছিল- একই গল্প অন্যরকম করে বলা, সেভাবেই বলেছে। ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা  কম-বেশী কে না জানে? তবে তার ভেতরকার গল্প খুবই সুক্ষ্ম। সেনসিটিভ।
গল্পটা ছোট করে বললে যা দাঁড়ায় তা এই- এক ব্যাভিচারী রাজা তার অবাধ যৌনাচারের জীবাণু বহন না করতে পেরে মারা গেলেন। এবং তার মৃত্যুর প্রায় বারো বছর কেটে যাবার পর অবিকল একই অবয়বে ফিরে এলেন একজন নাগা সাধু, এবং নিজেকে ওই এস্টেটের জমিদার বলে দাবি করলেন।এও বললেন যে তার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিলনা। তার শ্যালক এবং ডাক্তারের মিলিত প্রয়াস ছিল তার পেছনে।
এতটুকু তো সবাই (প্রায়) জানে। যেটুকু জানা নেই সেটুকু দেখতেই তো ছবি দেখতে যাওয়া। অতএব, সেই ফ্যাক্টের বর্ণনা না শুনে সিনেমা হলে একবার ঢুঁ মেরে আসাই বোধহয় ভালো হবে। চলে আসি সিনেমার উপস্থাপনায়। এক কথায় স্মার্ট। রাজার রাজকীয়তায়, অথবা বলা ভালো রাজকিয়তাকে অনস্ক্রিন ফুটিয়ে তোলায় কোথাও কার্পণ্য নেই। বাহুল্যতা নেই জমিদারের চরিত্র বিশ্লেষণে। যতটা প্রজাবৎসল ততটাই শিকারে দক্ষ, এবং ততটাই নারীসংশ্রবে আসক্ত। এক কথায় টিপিক্যাল রাজা। জমিদারের জমিদারি দেখাতে যতটা গ্র্যাঞ্জার দেখান হয়েছে ততটাই কালারফুল বেনারসের ঘাট। সমসাময়িক দেশের পরিস্থিতিও দেখাতে ভোলেননি সৃজিতবাবু।নাচঘরের সাজসজ্জা যতটা প্রমনেন্ট, ততটাই রিয়েল নিষিদ্ধপল্লীর এঁদো গলিগুলো। ঠিক তেমনই সাবলীল কোর্টরুমের সাদা-কালো দৃশ্যগুলো। এ যেন এক সুক্ষ্ম ইঙ্গিত কোর্ট কাছারি, মামলা মোকদ্দমা যাই দেখাক না কেন আসল জীবন রয়েছে অবাধ রাজকিয়তায়, বেঁচে থাকার মাদকিয়তায়। নাগা সন্ন্যাসীদের পায়ে হেঁটে দেশ বিদেশ পাড়ি দেওয়ায়। ব্যাভিচারি রাজা যতটা সত্যি, ছাইমাখা সন্ন্যাসীও ততটাই সত্যি।
জমিদার মহেন্দ্র কুমারের ভুমিকায় যিশু অসাধারণ। যতটা সুচারুভাবে রক্ষিতার সাথে দাবা খেলেন ততটা অবিস্মৃতিতেই ভুলে যান তার বিবাহিত স্ত্রীয়ের কথা। আবার ঠিক ততটাই অবিচল সন্ন্যাসীর ভূমিকায়। স্বাভাবিক ভাবেই উত্তম কুমারের অভিনয়ের সাথে একটা তুলনা আসতে পারে। তবে, এতুকুই বলার যে যীশুর অভিনয়ে একটা কমপ্লিটনেস আছে, তা সে দুরকম ভূমিকা পালন করায় হোক বা দুরকম বাচনভঙ্গিতেই হোক না কেন।জয়া এহসানের উপস্থিতি বেশ ধারালো, যেমন কঠিন তেমনই কোমল। এবং বাঙাল ভাষার তেক্সচার স্ত্রাকচার ধরে রাখার ক্ষমতা অসাধারণ। ডাক্তারের ভূমিকায় রুদ্রনীল মানানসই। জমিদারের শ্যালকের ভূমিকায় অনির্বাণের অভিনয় সেভাবে মুগ্ধ করলো না। বাদী ও বিবাদী পক্ষের উকিল হিসাবে অঞ্জন দত্ত ও অপর্ণা সেন যথাযথ, তবে তাদের ব্যক্তিগত সমস্যার গল্পটা না আনলেও মূল ঘটনার হেরফের হতো না এতটুকু বলে আমার ধারনা।
কিছু দৃশ্য বেশ মনের রাখার মতন। জমিদার ও তার রক্ষিতার দাবাখেলার দৃশ্যে একটা যৌন আবেদন আছে ঠিকই, তবে সস্তার সুড়সুড়ি নেই। এক আগাপাছতলা ছাইমাখা জটাধারী সন্ন্যাসীর দুচোখ বেয়ে নেমে জল নেমে আসার দৃশ্য যতটা বিরল, ততটাই স্পষ্ট তার ভেতরের টানাপড়েন। অসুস্থ জমিদারকে বিষ ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলার দৃশ্যটা মনে রাখার মতন। সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে বিশ্বাসী মানুষদের এক নিমেষে বদলে যেতে দেখলে বেড়িয়ে আসা আর্তির মত চিৎকার- আমি রাজা, আমি রাজা... বড় কষ্টের। এই ছবির গানগুলো বেশ সুন্দর। টাইটেল সং “এসো হে” হল থেকে বেড়িয়ে আসার পরও কানে বাজবে বহুক্ষণ। নাগা সন্ন্যাসীদের পরম মোক্ষ খুঁজে বেড়ানোর সময়কার “তু দিখে না” গানটির লিরিক্সগুলো খেয়াল করলে বোঝা যায় যে বেশ ভেবে লেখা হয়েছে। যদিও, “মহারাজ এ কি সাজে এলে হৃদয়পুরমাঝে” এই পুজা পর্যায়ের রবীন্দ্রসংগীতটিকে আক্ষরিক অর্থে নিলে দৃশ্যের সাথে মন্দ লাগবেনা।
সর্বোপরি, এই ছবি অনেককিছুর ওপর থেকে পর্দা সরাবে, নতুন কিছু তথ্য জানাবে, আবার অনেক কিছুকে ধোঁয়াশা করে ছেড়ে দেবে। আপনাকে নিজের মতো করে ভাবার স্পেস করে দেবে। ভাওয়াল সন্ন্যাসীর কেস জেনেই দেখুন বা না জেনেই দেখুন, বাড়ি এসে গুগল খুঁজতে আপনাকে বাধ্য করবেই। 

Comments

Popular posts from this blog

সমান্তরাল মানে ছুঁয়ে থাকা

দ্বিতীয় পুরুষঃ টুইস্টের চাপে হাঁসফাঁস করছে গল্পের লজিক

Game of Throne S08, S03: কি ভীষণ যুদ্ধ, ভয়, মৃত্যু, সাহসিকতা, সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন (spoiler free)